‘মৎস্যসম্পদ রপ্তানির প্রস্তুতি ও নীতিমালা প্রণয়নে সরকার কাজ করবে’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক মৎস্য সামিট ও মেলায় উপদেষ্টা ফরিদা আখতার

নিজস্ব প্রতিবেদক :
অন্তর্বর্তী সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেছেন, ‘বাংলাদেশ থেকে মৎস্যসম্পদ বিদেশে রপ্তানির উপযোগী করার জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও নীতিমালা গ্রহণের সময় এসেছে। সরকার এই কাজে সর্বাত্তক সহযোগিতা করবে।’ গতকাল শনিবার (২২ নভেম্বর) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক মৎস্য সামিট ও মেলায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। রাজশাহী অঞ্চলের মৎস্য শিল্প রপ্তানিমূখি পণ্য হিসেবে সংযোগ স্থাপনের জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারীজ অনুষদ এবং রাজশাহী বাণিজ্যিক মৎস্য চাষী সমবায় সমিতি যৌথভাবে এই সামিট ও মেলার আয়োজন করে।
উপদেষ্টা বলেন, দেশের মাছের চাহিদার ৪০ শতাংশই পূরণ করছে রাজশাহী। তিনি বলেছেন, ময়মনসিংহে বেশি মাছ চাষ হলেও রাজশাহীর অবদানও কম নয়।’ তিনি বলেণ, ‘বাংলাদেশে মাছ উৎপাদন দুইভাবে হয়ে থাকে। একদিকে নদী, খাল-বিল, হাওড়-বাঁওড় থেকে অপরদিকে মৎস্য চাষের মাধ্যমে। দুটো পদ্ধতিই গুরুত্বপূর্ণ। মৎস্য চাষ নিজের গুণেই এগিয়ে যাচ্ছে। অ্যাকুয়াকালচার মাধ্যমে মৎস্য চাষের কারণে বাজারে মাছের সরবরাহ বেড়েছে, ফলে সাধারণ মানুষ সাশ্রয়ী দামে মাছ খাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। তার মানে এই নয় যে, আমরা প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত মাছ ধরবো না, খাবো না।’
তিনি বলেন, ‘মাছ রপ্তানি হতেই হবে। যে-সব দেশে মাছ রপ্তানি করবেন, সেসব দেশেও বাঙালি আছে। আপনার এই মাছটি তারাই খাবে। প্রবাসীরা কষ্ট করে আমাদের রেমিট্যান্স পাঠায় অথচ তারা যদি মাছ না পায় সেটা দুঃখজনক ব্যাপার। আমি মনে করি, আমাদের রপ্তানির সুযোগ অবশ্যই তৈরি করতে হবে। এসময় তিনি কার্পজাতীয় মাছের রপ্তানি বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।’
মৎস্যচাষের ফিড নিরাপদ কিনা- এ প্রশ্ন তুলে উপদেষ্টা বলেন, ‘মাছচাষ করতে গিয়ে নিরাপদ ফিডের প্রয়োজন হয়। ফিড যদি নিরাপদ না হয়, তাহলে যে মাছটা উৎপাদিত হচ্ছে সেটা ভোক্তার স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করবে। তাই অনিরাপদ ফিড যাতে বাজারে না আসে সেদিকে নজর রাখতে হবে। নিরাপদ ফিডের পাশাপাশি মাছের জন্য নিরাপদ ওষুধও নিশ্চিত করতে হবে।’
ফরিদা আখতার বলেন, ‘মৎস্যচাষ নীতি প্রণয়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব। এটা হলে চাষি হিসেবে করণীয় বিষয়গুলো স্পষ্ট হবে। এ নীতি প্রণয়নের মাধ্যমে উদ্ভূত সমস্যার সমাধান সহজ হবে। এ সময় তিনি ইলিশ রক্ষা এবং কৃষিজমিতে পুকুর খনন না করে, অনাবাদি জমিতে পুকুর খনন করে মৎস্য চাষের জন্য সবাইকে আহ্বান জানান।’
উপদেষ্টা বলেন, ‘রাজশাহীর চাষীরা বাংলাদেশে মৎস্য চাষে যুগান্তকারী পরিবর্তন করেছেন। বিদেশ নির্ভর বড় আকারের রুই থেকে রাজশাহীর জীবন্ত রুইজাতীয় মাছ আজ দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়েছে। আজ সময় এসেছে, মৎস্য সম্পদ বিদেশে রপ্তানি উপযোগী করার জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, নীতিমালা গ্রহন করা। সরকার এই কাজে সর্বাত্তক সহযোগিতা করবে।’
অনুষ্ঠানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক, রাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ হাসান নকীব বলেন, ‘বাংলাদেশের মৎস্য চাষের বিকাশে এবং স্বাদুপানির মাছ রপ্তানিতে আজকের এই সামিট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।’
বিশেষ অতিথি মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. আব্দুর রউফ বলেন, ‘আজকের এই উদ্যোগ সামনে এগিয়ে নিতে মৎস্য অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।’
অনুষ্ঠানের সভাপতি, রাবি’র ফিশারীজ অনুষদের ডীন অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান মন্ডল বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে একাডেমি ও ইন্ডাস্ট্রীর যৌথ উদ্যোগে এমন আয়োজন এবারই প্রথম। আমার বিশ্বাস এই উদ্যোগ দেশের রপ্তানি শিল্পে যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে।’
মূলপ্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রাবি ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ আখতার হোসেন। পৃষ্ঠপোষক ছিলেন রাবি উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন ও উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. মো. ফরিদ উদ্দিন খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিশেষ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহির মুহাম্মদ জাবের, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. অনুরাধা ভদ্র, ওয়ার্ল্ডফিশ বাংলাদেশের প্রতিনিধি ড. ফারুক-উল-ইসলাম ও রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার ড. আ.ন.ম. বজলুর রশীদ। স্বাগত বক্তব্য দেন সম্মেলন আয়োজক কমিটির সদস্য সচিব, রাজশাহী বাণিজ্যিক মৎস্য চাষী সমবায় সমিতির কোষাধ্যক্ষ ড. অক্ষয় কুমার সরকার। কো-কনভেনর ছিলেন রাজশাহী বাণিজ্যিক মৎস্য চাষী সমবায় সমিতির সভাপতি মো. সাদিকুল ইসলাম। এছাড়া নাবিল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কৃষিবিদ আমিনুল ইসলাম স্বপন, বাংলাদেশ ফ্রজেন ফুড এক্সপোর্টার এসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি এসকে কামরুল আলম প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
আয়োজকরা জানান, টেকসই মৎস্য পালন ও রপ্তানিতে অংশীজনদের সংযোগ স্থাপনে এই সামিট ও মেলার আয়োজন। এতে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, থাইল্যান্ড ও আমেরিকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা, গবেষক, শিক্ষক, মৎস্য চাষী, আমদানি-রপ্তানিকারক, সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তা ও নীতি নির্ধারকেরা রাজশাহী অঞ্চলের মৎস্য চাষী ও রপ্তানি বাজারে সংযোগ স্থাপনে আলোচনা ও কর্মপরিকল্পনা করেন। এতে সংশ্লিষ্ট ২৫টি ফিড, একুয়া মেডিসিন ও যন্ত্রপাতি উৎপাদনকারী কোম্পানী বিভিন্ন পণ্য প্রদর্শন করে। এই সামিট ও মেলা থেকে সুপারিশমালা সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের রুই জাতীয় মাছের বড় অংশ একসময় আমদানি নির্ভর ছিল। বিশেষ করে মায়ানমার ও ভারত থেকে প্রচুর রুই জাতীয় মাছ আমদানি করা হত। সারাদেশে যখন ১-২ কেজি ওজনের রুই মাছের যোগান ছিল, তখন ২০১৩-১৪ সালের রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলার মৎস্য চাষীরা সর্বপ্রথম বড় আকারের পাঁচ থেকে ছয় কেজির রুই মাছ উৎপাদন শুরু করেন। রাজশাহীর বড় আকারের রুই মাছ সারা দেশের ভোক্তাদের মাঝে আলোড়ন সৃষ্টি করে। প্রথমদিকে ফ্রোজেন হিসেবে বড় রুই মাছ সারাদেশে বিক্রি হলেও পরবর্তীতে জীবিত (লাইভ) মাছ বিক্রি শুরু হয়। বর্তমানে রাজশাহী অঞ্চল থেকে প্রতিদিন গড়ে তিনশ’ ট্রাক জীবিত রুই মাছ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে যোগান হচ্ছে। রাজশাহীর মাছ গুণগত মানের কারণে দেশের বাইরে রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। কার্প জাতীয় মাছ বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব। বাংলাদেশ শুধু চিংড়ি রপ্তানি করে। স্বাধুপানির মাছ রপ্তানি করে চীন (তেলাপিয়া), ভিয়েতনাম (পাঙ্গাস), থাইল্যান্ডের (ভেটকি) মত বাংলাদেশও এসব মাছ রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারে।





