রাজশাহীতে ঐতিহ্যবাহী তিরোভাব মহোৎসব শুরু

লাখ ভক্তের পদচারণায় নরোত্তম ঠাকুরের তিরোভাব মহোৎসব শুরু হয়েছে, নিরাপত্তায় ৫০০ পুলিশ

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজশাহীতে লাখ ভক্তের পদচারণায় নরোত্তম দাস ঠাকুরের খেতুরিভাব বা তিরোভাব মহোৎসব শুরু হয়েছে। নিরাপত্তায় রয়েছে ৫০০ পুলিশ সদস্য।
রীতি অনুযায়ী লক্ষী পূর্ণিমার পর পঞ্চমী তিথিতে ঠাকুর মহাশয়ের তিরোভাব তিথি অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম দিন ভক্তদের নাম প্রার্থনার মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে বৈষ্ণব ধর্মাচারে বিশ্বাসী দেশ-বিদেশের সন্ন্যাসভক্তদের পদচারণায় আর অষ্টপ্রহর কীর্তন ও প্রসাদ গ্রহণ-সহ চলে নানা ধর্মীও আচার অনুষ্ঠান।
তৃতীয় দিন ভক্তদের গঙ্গাস্নানের পর দীর্ঘ প্রার্থনার মধ্য দিয়ে শেষ হয় তিরোভাব মহোৎসব।
তিরোভাব উৎসবকে কেন্দ্র করে চলে মেলার আয়োজন। মেলায় ধর্মীও উপকরণ থেকে শুরু করে সৌখিন ও বাহারী খাদ্য সামগ্রী, পোশাক, ব্যবহার্য, গৃহস্থালি, কারু-চারু, কামার-কুমারের তৈরি পণ্যসহ থাকে সবধরনের সমাহার।
খেতুর মেলা মূলত সন্ন্যাসীদের মেলা হলেও এখানে অহিংসা ও মানবপ্রেমে বিশ্বাসী অন্য ধর্মের অনুসারীরাও আসেন মেলায়।
খেতুরিধামের ট্রাস্টি বোর্ডের সম্পাদক শ্যামাপদ সান্যাল বলেন, “শত শত বছর ধরে ধর্মীও ভাবগাম্ভীর্য ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ উৎসব হয়ে আসছে। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা ছাড়াও মুসলিমসহ অন্যান্য ধর্মের মানুষও এখানে আসেন ৷ এবারও বর্তমান ট্রাস্টি বোর্ডের ব্যবস্থাপনায় এবং প্রশাসনের সর্বাত্মক সহযোগিতায় সুষ্ঠুভাবে তিরোভাব মহোৎসব সম্পন্ন হবে বলে আশা করছি।”
গোদাগাড়ীর ইউএনও ফয়সাল আহমেদ বলেন, “ঐতিহ্যবাহী এ উৎসবটি যেন যথাযথ ধর্মীও ভাবগাম্ভীর্যে এবং সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয় সেজন্য গোদাগাড়ী উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। এছাড়া জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশের সার্বিক নির্দেশনা ও সর্বাত্মক সহযোগিতাও রয়েছে আমাদের সঙ্গে।”
শুক্রবার থেকে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলীর খেতুরীধামে শত শত বছরের ঐতিহ্যের এ উৎসব শুরু হয়েছে।
নরোত্তম দাস ঠাকুর অহিংসার মহান সাধক ছিলেন। সনাতন হিন্দু বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করতে গিয়ে সমাজে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা ও মানবসেবার কাজ করেছেন তিনি। ১৫৩১ খ্রিস্টাব্দে রাজশাহী জেলার গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলী পদ্মাতীরের গোপালপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। মৃত্যুবরণ করেন ১৬১১ খ্রিস্টাব্দে প্রেমতলী খেতুরধামে।
নরোত্তম দাস ঠাকুরের বাবা ছিলেন জমিদার কৃষ্ণনন্দ দাস মজুমদার। ধনী বাবার একমাত্র সন্তান হওয়া সত্ত্বেও ঐশ্বর্য তার জীবনে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারেনি। তিনি ছোটবেলা থেকেই ধর্মপরায়ণ, সংসার বৈরাগী ও উদাসীন প্রকৃতির ছিলেন। ঠাকুর নরোত্তম দাসের বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার, সমাজ সংস্কার ও মানবসেবার কাছে হার মানে সমাজের ধনী, ভূ-স্বামী, দুর্দান্ত নরঘাতক, ডাকাত সবাই তার পায়ের কাঠে লুটিয়ে পড়েছিলেন।
জীবদ্দশায় নরোত্তম দাস নিজ গ্রাম গোপালপুরের সন্নিকটে খেতুরিতে আশ্রম নির্মাণ করে ধর্মসাধনায় নিয়োজিত ছিলেন। এখানে তিনি প্রায় সাধারণ বেশে অবস্থান করেছিলেন। বাবার অনুরোধ উপেক্ষা করে, বিলাস পরিত্যাগ করে তিনি স্থানীয় কৃষ্ণমন্দিরে প্রায় সন্ন্যাসীর জীবনযাপন করেছিলেন।

গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজের মধ্যে তার খ্যাতি ও সাধনার ফল ছড়িয়ে পড়েছিল। নরোত্তমের দ্বিতীয় প্রধান অবদান বৈষ্ণব সমাজ পদাবলি কীর্তন বা লীলা রসকীর্তনের প্রবর্তন করা।
বাংলা সংগীত জগতের বিবর্তনের ইতিহাসে পদাবলি কীর্তন প্রায় চারশ বছর ধরে জনপ্রিয় হয়ে রয়েছে। তার সাহিত্যকর্ম মধ্যযুগের পদাবলি সাহিত্যের ইতিহাসে অতুলনীয় সম্পদ।

সংশ্লিষ্ট খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button