রাজশাহীতে হারিয়ে গেছে তিন নদী: বাঁচার লড়াইয়ে বারাহী, স্বরমংলা, দয়া

অনলাইন ডেস্ক : প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৪৩ এএম আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৫ পিএম ২৮ বার পঠিত
রাজশাহীতে হারিয়ে গেছে তিন নদী: বাঁচার লড়াইয়ে বারাহী, স্বরমংলা, দয়া

রাজশাহীতে হারিয়ে গেছে তিন নদী: বাঁচার লড়াইয়ে বারাহী, স্বরমংলা, দয়া

দৈনিক রাজশাহী
৩০ সেপ্টে ২০২৬

একদা রাজশাহী নগরের বুক চিরে বয়ে যেত তিনটি নদী বারাহী, স্বরমঙ্গলা ও দয়া। পদ্মা থেকে উৎপত্তি হয়ে এসব নদী নগরের বিভিন্ন এলাকা পেরিয়ে আশপাশের নদ-নদী ও বিলে গিয়ে মিশত। নদীকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল জনবসতি, নৌপথ, বাজার, রেশমশিল্পসহ নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে সেই চিত্র। নগর সম্প্রসারণ, বাঁধ নির্মাণ, জলকপাট, দখল ও ভরাটের কারণে নদীগুলোর অস্তিত্ব প্রায় হারিয়ে গেছে। কোথাও নদীর জায়গায় তৈরি হয়েছে সড়ক ও স্থাপনা, কোথাও পরিণত হয়েছে ড্রেন বা নর্দমায়। আবার কোথাও নিচু জলাভূমি কিংবা সরু জলধারার মধ্যে এখনো টিকে আছে পুরোনো নদীর স্মৃতি।

চন্দ্রিমা থানার বালানগর গ্রামের বাসিন্দা খলিলুর রহমান (৫৫) ছোটবেলার স্মৃতি মনে করে বলেন, “আমরা এ নদীতে গোসল করেছি। আমার দাদাদের মুখে শুনেছি, নদীতে লঞ্চ পর্যন্ত চলেছে। এখন কোথাও কোথাও নদী আর নেই। যেটুকু আছে, তা-ও কচুরিপানায় ঢাকা। নদীটির কী নাম ছিল, তা জানি না। এখন আমরা এটাকে রাইচাঁদ নালা বলি।”

স্থানীয় মানুষের কাছে ‘রাইচাঁদ নালা’ নামে পরিচিত এই জলধারার একটি অংশ একসময়কার স্বরমঙ্গলা নদীর প্রবাহের সঙ্গে যুক্ত ছিল। নদীর নাম হারিয়ে গেলেও পুরোনো প্রবাহপথের কিছু চিহ্ন এখনো নগরের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়।

বাঁধ ও জলকপাটে হারাতে শুরু নদী

নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকীর ফিরিয়ে দাও সেই প্রবাহ বইয়ে রাজশাহীর হারিয়ে যাওয়া নদীগুলোর বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। বইটির তথ্য অনুযায়ী, ১৮৮৫ সালে বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে পদ্মা নদীর তীর ঘেঁষে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা হয়। নগরের বুলনপুর থেকে তালাইমারী পর্যন্ত তৈরি করা হয় ১২টি স্লুইসগেট বা জলকপাট। নদীগুলোর উৎসমুখেও বসানো হয় জলকপাট।

এর ফলে নদীগুলোর উৎসমুখে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে থাকে। ধীরে ধীরে উৎসমুখ ভরাট ও মরে যেতে থাকে। একপর্যায়ে নদীগুলো স্বাভাবিক প্রবাহ হারিয়ে মানুষের স্মৃতি ও স্থানীয় নামের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

বর্তমানে পদ্মার বাঁ তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় নদীর তীরে ব্লক বসিয়ে পাকা করা হয়েছে। এতে একসময়কার কয়েকটি নদীর উৎসমুখও দৃশ্যমানতা হারিয়েছে।

বারাহী এখন বড় ড্রেন

রাজশাহীর হারিয়ে যাওয়া নদীগুলোর মধ্যে অন্যতম বারাহী। ব্রিটিশ ভারতের ডিরেক্টর জেনারেল অব স্ট্যাটিসটিকস ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য উইলিয়াম উইলসন হান্টারের স্ট্যাটিস্টিক্যাল অ্যাকাউন্ট অব দ্য ডিস্ট্রিক্ট অব রাজশাহী গ্রন্থেও এ নদীর উল্লেখ পাওয়া যায়।

পুরোনো তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী নগরের ফুদকিপাড়া মহল্লার কাছে পদ্মা থেকে বারাহী নদীর উৎপত্তি হয়েছিল। নগরের ভেতর দিয়ে প্রায় ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পবা উপজেলার মহানন্দখালী গ্রামে গিয়ে নদীটি বারনই নদে মিশেছিল।

পদ্মা থেকে বের হওয়ার পর প্রথম প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় এখন বারাহীর কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন নেই। মন্নুজান প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পশ্চিম পাশ দিয়ে নদীর পুরোনো প্রবাহ একটি স্লুইসগেটের দিকে এগিয়ে যেত। এরপর সাহেব বাজার বড় মসজিদকে পশ্চিম পাশে রেখে জিরো পয়েন্ট অতিক্রম করত।

আজ সেখানে নদী নেই। আছে বড় একটি ড্রেন, স্থানীয়ভাবে যা ‘এক নম্বর ড্রেন’ নামে পরিচিত। একসময় যে জলধারা পদ্মার সঙ্গে যুক্ত ছিল, সেই প্রবাহপথ এখন নগরের পানি ও বর্জ্য নিষ্কাশনের কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।

বারাহীর পুরোনো প্রবাহ তুলাপট্টি, রানীবাজার ও ষষ্ঠীতলার নিচ দিয়ে এগিয়ে নগর ভবনের গ্রিন প্লাজার নিচ দিয়ে যেত। এরপর গ্রেটার রোড অতিক্রম করে রেললাইনের পাশ দিয়ে গোরহাঙ্গা মোড়ের দিকে যেত নদীটি। স্টেশন রোড অতিক্রম করে রেলওয়ে অফিস চত্বর, স্টেডিয়ামের পূর্ব পাশ এবং বিজিবি সেক্টর হেডকোয়ার্টার্সের মধ্য দিয়ে বড়বনগ্রামে প্রবেশ করত।

বড়বনগ্রামে নদীর পুরোনো অস্তিত্বের স্মৃতি বহন করছে ‘পবা গাঙপাড়া’ নামের একটি মৌজা। নদী বা গাঙকে কেন্দ্র করেই এ নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

এরপর বারাহী পবা উপজেলার মুশরইল, কৃষ্ণগঞ্জ, মতিয়ারবিল, সন্তোষপুর, বায়া ও সিন্দুরকুসুম্বী পেরিয়ে মহানন্দখালী গ্রামে পৌঁছাত। সেখানে গিয়ে বারনই নদে মিশত। বায়া ও কৃষ্ণগঞ্জে একসময় নদীবন্দরও ছিল বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।

বর্তমানে পবার মুশরইল এলাকায় একটি কালভার্টের নিচ দিয়ে বারাহীর পুরোনো প্রবাহের কিছু অংশ টিকে আছে। তবে সেখান দিয়েও এখন মূলত শহরের বর্জ্যপানি প্রবাহিত হয়।

মুশরইলের প্রবীণ বাসিন্দা ফজলুর রহমান বলেন, “এখান দিয়েই একসময় নদী ছিল। নদীতে টলটলে পানি থাকত। ছোটবেলায় আমরা সাঁতার কেটেছি। সেই নদী দিনে দিনে মরে গেছে। নদীর ওপর মানুষের ঘরবাড়ি উঠেছে।”

স্বরমঙ্গলার উৎসমুখও নেই

রাজশাহী নগরের তালাইমারী এলাকায় ছিল স্বরমঙ্গলা নদীর উৎসমুখ। পদ্মা থেকে উৎপত্তি হয়ে নদীটি কাজলা, জামালপুর ও নামোভদ্রা এলাকার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নগর পেরিয়ে পবার দিকে চলে যেত। ললিতাহার, ভালুকপুকুর ও রামচন্দ্রপুর হয়ে এর প্রবাহ পৌঁছাত ফলিয়ার বিলে।

একসময় খরস্রোতা এই নদী নগরের যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। নদীপথে নৌকা চলাচল করত। নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল বসতি ও রেশমশিল্পের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড।

স্বরমঙ্গলার প্রবাহের সঙ্গে রাজশাহীর পুরোনো লোককথাও জড়িয়ে আছে। কথিত আছে, ধনপতি সওদাগর নামের এক ব্যবসায়ী তাঁর ছেলের বরযাত্রী নিয়ে এই নদীপথে যাওয়ার সময় বর্তমান রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (রুয়েট) এলাকায় নৌকাডুবিতে মারা যান। রুয়েট ক্যাম্পাসের উত্তর-পূর্ব অংশ এখনো ‘নাওডোবা’ নামে পরিচিত। নিচু জলাভূমির এই অংশ দেখলে পুরোনো নদীর প্রবাহের অস্তিত্ব অনুমান করা যায়।

তবে নগর সম্প্রসারণ ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় স্বরমঙ্গলা এখন আর নদী হিসেবে দৃশ্যমান নয়। হারিয়ে গেছে এর উৎসমুখও।

স্বরমঙ্গলা থেকে জন্ম দয়া নদীর

স্বরমঙ্গলার একটি শাখা ছিল দয়া নদী। বর্তমান রুয়েট এলাকার প্রায় ২০ থেকে ২৫ গজ পূর্ব দিক থেকে দয়া নদীর প্রবাহ শুরু হয়ে উত্তরমুখী হয়েছিল। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম দেয়াল ঘেঁষে নদীটি এগিয়ে যেত।

প্রায় আধা কিলোমিটার পথ পেরিয়ে দয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পশ্চিম ও উত্তর দেয়াল অতিক্রম করে রেললাইনের কাছে পৌঁছাত। রেললাইনের নিচে নদীর ওপর ছিল একটি ছোট রেলওয়ে কালভার্ট।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কবরস্থানের পাশের পাকা সড়কসংলগ্ন দীর্ঘদিনের নিচু জলাভূমিটিও দয়া নদীর অংশ ছিল বলে স্থানীয়দের দাবি। সমতল থেকে প্রায় চার ফুট গভীর ও প্রায় ২৫ গজ প্রশস্ত এই জলাভূমিতে বছরের প্রায় ছয় মাস পানি থাকত। সেখানে ছিল বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ।

দয়া নদী একসময় মেহেরচণ্ডী, খড়খড়ি বাজার, কুখুণ্ডী, বামনশিকড়, মল্লিকপুর, তেবাড়িয়া, সারাংপুর ও শিরোলিয়া অতিক্রম করে ঘোলহাড়িয়া গ্রামে পৌঁছাত। সেখানে গিয়ে এর প্রবাহ রাইচাঁদ নদের সঙ্গে যুক্ত হতো।

নদীর সঙ্গে হারিয়েছে পুরোনো রেশমশিল্পও

দয়া নদীর ইতিহাসের সঙ্গে রাজশাহীর পুরোনো রেশমশিল্পেরও সম্পর্ক ছিল। অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে দয়া নদীর তীরে একাধিক ছোট রেশম কারখানা গড়ে উঠেছিল বলে পুরোনো বইপত্রে উল্লেখ পাওয়া যায়।

তখন নদী শুধু পানির প্রবাহ ছিল না; এটি ছিল যোগাযোগের পথ। নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল মানুষের বসতি, বাজার ও নানা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড। নদী হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই পুরোনো জলপথভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামোরও পরিবর্তন হয়েছে।

২০১৯ সালে রেললাইনের ওপর দিয়ে উড়ালসেতু নির্মাণের প্রকল্প নেওয়ার পর দয়া নদীর পুরোনো প্রবাহের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিচু জলাভূমি ভরাট করা হয়। ফলে নদীর দৃশ্যমান চিহ্ন আরও কমে যায়।

এখনো কি ফিরতে পারে নদীগুলো?

নদী গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, রাজশাহীর হারিয়ে যাওয়া স্বরমঙ্গলা নদীর অনেক জায়গা এখনো দখলমুক্ত রয়েছে। এসব অংশ চিহ্নিত করে খনন করা হলে সেগুলো সেচসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা সম্ভব।

রাজশাহী জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম বলেন, ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী সিএস রেকর্ডে যেখানে নদী ছিল, সেই জায়গাগুলো প্রশাসন ইতোমধ্যে চিহ্নিত করেছে। পিলার বসানো ও দখলমুক্ত করার জন্য চিঠি দিয়ে বরাদ্দের আবেদন করা হয়েছে।

রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) রাজশাহী শাখার সভাপতি জামাত খান বলেন, “রাজশাহী শহরের ভেতর দিয়ে যাওয়া অন্তত তিনটি নদী হারিয়ে গেছে। আরএস ও সিএস রেকর্ডের কাগজপত্র দেখে নদীগুলো উদ্ধার করতে হবে।”

একসময় যে নদীগুলো রাজশাহীর মানুষের জীবন, যোগাযোগ ও অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ছিল, আজ সেগুলোর বেশির ভাগই দৃশ্যমান নয়। কোথাও ড্রেন, কোথাও জলাভূমি, কোথাও আবার সড়ক-স্থাপনার নিচে চাপা পড়ে আছে তাদের পুরোনো প্রবাহপথ।

তবে পুরোনো নথি, ভূমি রেকর্ড ও স্থানীয় মানুষের স্মৃতিতে এখনো টিকে আছে বারাহী, স্বরমঙ্গলা ও দয়ার অস্তিত্ব। সেসব চিহ্ন ধরে নদীগুলোকে পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া গেলে হারিয়ে যাওয়া জলপথের কিছু অংশ হয়তো আবারও ফিরে পেতে পারে রাজশাহী।

সম্পর্কিত নিউজ

অ্যাপ ইনস্টল করুন

এই নিউজ পোর্টালটি মোবাইল অ্যাপের মতো ব্যবহার করুন।