ইউক্রেন যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা: বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রাশিয়া
ইউক্রেন যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা: বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রাশিয়া
প্রথমে একটা মৃদু ঘড়ঘড় শব্দ, এরপর ধুলোর ঝড়। মনিটরের ঝাপসা স্ক্রিনটি স্পষ্ট হওয়ার জন্য সামান্য বিরতি, আর পরক্ষণেই এক ভয়াবহ বিস্ফোরণ!
মাটির বহু গভীরে, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মাইলের পর মাইল দূরে বসে এক নতুন ধরনের যুদ্ধের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইউক্রেনীয় কমান্ডাররা। আভিদিভকা আর বাখমুতের মতো সবচেয়ে নৃশংস নগর যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থাকা এই যোদ্ধারা এখন এমন এক ধ্বংসযজ্ঞের চালক—যা তারা নিজেরা সরাসরি দেখতে বা অনুভব করতে পারছেন না।
সম্প্রতি পূর্ব ইউক্রেনে রাশিয়ার তিনটি ফ্রন্টলাইন লক্ষ্যবস্তুতে ছয়টি বিস্ফোরণ ঘটানোর পুরো অভিযানে মাটিতে কোনো ইউক্রেনীয় সেনার প্রয়োজনই পড়েনি। এর বদলে পুরো যুদ্ধটি পরিচালিত হয়েছে গেমিং চেয়ারে বসে, মাথার ওপরে থাকা নজরদারি ড্রোন থেকে আসা লাইভ স্ট্রিমের মাধ্যমে।
জানা গেছে, কয়েক মাস ধরে সেনা সংকট এবং যুক্তরাষ্ট্রের অনিশ্চিত সহায়তার কারণে ধুঁকতে থাকা ইউক্রেনীয় বাহিনী নিজেদের এক অবিশ্বাস্য বিবর্তন ঘটিয়েছে। তাদের যুদ্ধের এক বড় অংশ এখন হিউম্যানলেস বা ‘মানবহীন’ হয়ে পড়েছে। রোবট, ড্রোন এবং দূরনিয়ন্ত্রিত ট্যাংকগুলো ইউক্রেনকে রাশিয়ার বিশাল ও ক্লান্ত আক্রমণকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে এক আকস্মিক, যদিও কিছুটা ভঙ্গুর, সুবিধাজনক অবস্থানে এনে দাঁড় করিয়েছে।
গত এপ্রিলে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি দাবি করেন, প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ রোবট ও ড্রোনের সাহায্যে তারা রাশিয়ার একটি ঘাঁটি দখল করেছেন। তিনি আরও জানান, জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত মানবহীন যুদ্ধযন্ত্রগুলো ২২ হাজারেরও বেশি মিশন পরিচালনা করেছে।
কম্পিউটার প্রসেসরের মৃদু কমলা আলো আর মাথার ওপরের টিমটিমে বাতির নিচে বসে নতুন নতুন সব উদ্ভাবন করছে ইউক্রেনীয় বাহিনী। কারণ, টিকে থাকার লড়াই-ই সব আবিষ্কারের মূল। এই ইউনিটের যোদ্ধারা রুশ যুদ্ধবন্দিদের কাছ থেকে জানতে পেরেছেন যে, শত্রুরা তাদের এই রোবটগুলোকে ‘নীরব মৃত্যু’ (সাইলেন্ট ডেথ) নামে ডাকে। চার চাকার চ্যাসিসের ওপর বিশাল বিস্ফোরক বহনকারী এই রোবটগুলো যখন মাত্র ১০ মিটার দূরত্বে পৌঁছায়, কেবল তখনই শত্রুরা টের পায়। কিন্তু ততক্ষণে তারা বিস্ফোরণের সীমানার মধ্যে চলে আসে।
প্রথম রোবটটি অ্যালুমিনিয়ামের ধ্বংসস্তূপের ওপর কিছুটা হোঁচট খেল। এর চাকাগুলো বাধা পেরিয়ে এগিয়ে যাওয়ার জন্য মরিয়া চেষ্টা চালাতে লাগল। অবশেষে এটি একটি গর্ত এড়িয়ে সামনে এগিয়ে গেল এবং ওপরের নজরদারি ড্রোন থেকে দেখা গেল একটি ছোট মাশরুম ক্লাউডের মতো সাদা আগুনের শিখা—যা ছিল প্রথম বিস্ফোরণের থার্মাল ফুটপ্রিন্ট। এরপর দ্বিতীয় বিস্ফোরণটি ঘটল। এই প্রাথমিক হামলার উদ্দেশ্য ছিল রুশ সেনাদের মনোযোগ অন্য দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া, যাতে বাকি চারটি রোবট অনায়াসে শত্রুর সীমানার ভেতরে ঢুকে পড়তে পারে।
হিসাবটা এখানে বেশ সহজ। থার্ড অ্যাসাল্ট ব্রিগেডের ‘NC13’ ইউনিট হিসাব করে দেখেছে, গত ১৬৪টি হামলায় রোবটের জায়গায় সমপরিমাণ কার্যকারিতা পেতে তাদের ২ হাজার ৩০০ জন সেনার প্রয়োজন হতো। আর তেমনটা হলে অন্তত অর্ধেক সেনাকে তারা হারাত—হয় নিহত না হয় আহত হিসেবে। ফলে স্ক্রিনে দেখতে পাওয়া এই ধীরগতির চলনক্ষম বোমাগুলো আসলে এক প্রযুক্তিগত আশীর্বাদ, যা এ পর্যন্ত অন্তত এক হাজার ইউক্রেনীয় সেনার জীবন বাঁচিয়েছে।
ডনবাসে এক সময়কার রক্তক্ষয়ী নগর যুদ্ধের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে এই ইউনিটের ডেপুটি কমান্ডার বলেন, তখনকার দিনে এমন কিছুর কথা ভাবাই যেত না। কিন্তু এখন বুঝি, সেই সময়ে যদি এই প্রযুক্তি থাকত... তবে আমার আরও অনেক কমরেড আজকে বেঁচে থাকত।
তবে ইউনিটের কমান্ডার মাইকোলা ‘মাকার’ জিনকেভিচের কাছে এ নতুন বিশ্ব কিছুটা খাপছাড়া। তিনি বলেন, তখনকার যুদ্ধ ছিল অনেক বেশি পুরুষোচিত। সেখানে আপনার দক্ষতা, প্রশিক্ষণ আর শৃঙ্খলা ম্যাটার করত। আর এখন, প্রযুক্তিই সবকিছু নির্ধারণ করে দিচ্ছে। এখান থেকে পেছনে ফেরার আর কোনো সুযোগ নেই। এখন প্রশ্ন কেবল একটাই—দূরনিয়ন্ত্রিত ও মানবহীন হত্যার এই যুগে কে কত দ্রুত নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।
নতুন যুদ্ধ, নতুন নায়ক
ইউক্রেনের এই নতুন যুদ্ধকৌশল মূলত তীব্র জনবল সংকট থেকে তৈরি হয়েছে। চার বছর ধরে চলা রুশ আগ্রাসনে দেশটির ছোট জনসংখ্যা আরও বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। তবে কিয়েভ শুরু থেকেই যেভাবে ড্রোন প্রযুক্তির বিকাশ এবং এর নিখুঁত কার্যকারিতার ওপর জোর দিয়েছে, তা এখন মস্কোর ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।
ইউক্রেনের বর্তমান নীতি হলো প্রতি মাসে অন্তত ৩৫ হাজার রুশ সেনাকে হতাহত করা, যা তারা চলতি বছরে অর্জনও করেছে। ক্রেমলিনকে যাতে বাধ্য হয়ে বড় শহর ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো থেকে সেনাবাহিনীতে লোক নিয়োগ করতে হয়—যা রাশিয়ার অভ্যন্তরে পুতিনের জনপ্রিয়তায় ধাক্কা দেবে—সেই লক্ষ্যেই এ পরিকল্পনা।
গত ২৭ মে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা জিসিএইচকিউ নতুন তথ্যের ভিত্তিতে জানিয়েছে, যুদ্ধে এ পর্যন্ত রাশিয়ার মোট নিহতের সংখ্যা ৫ লাখ ছাড়িয়েছে।
এ নতুন যুদ্ধের নায়কেরাও অন্য রকম। যেমন ২২ বছর বয়সি ‘গোরা’। নিজেকে প্রথমে শুধু একজন ‘সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে পরিচয় দিলেও দ্রুতই তা সংশোধন করে তিনি বলেন, আমি একজন এমবেডেড হার্ডওয়্যার অ্যান্ড সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। ১৮ বছর বয়সে যখন যুদ্ধ শুরু হয়, তখন কিয়েভের পূর্বাঞ্চলে রুশ ড্রোনের শব্দে ঘুমাতে না পেরে ক্ষুব্ধ গোরা বুঝতে পেরেছিলেন, তার আইটি মেধা দিয়েই ফ্রন্টলাইনে লড়াই করতে হবে।
গোরা বলেন, আসল বিষয় যুদ্ধযানগুলো নয়, আসল হলো মানুষের মস্তিষ্ক এবং তারা কীভাবে পরিকল্পনা করছে। অপারেটর ও যানের মধ্যে যোগাযোগ কীভাবে রক্ষা করা হচ্ছে, সেটাই মূল চাবিকাঠি।
চ্যালেঞ্জগুলোও প্রতিনিয়ত পালটাচ্ছে। এক অপারেটর তার কমান্ডারকে বললেন, স্যালাম্যান্ডার-৬ জিপিএস ট্র্যাকিং হারিয়েছে। আমরা আনুমানিক একটা পথ তৈরি করে জিপিএস ছাড়াই এগিয়ে যাচ্ছি।
যুদ্ধক্ষেত্রে লোকেশন ডেটার ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাটা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় দিনের বেলায় ড্রোনে রেকর্ড করা ভিডিও দেখে এবং বোমায় ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়া ফসলি জমির নিখুঁত রুট ম্যাপ তৈরি করে রোবটগুলোকে পথ দেখাতে হয়।
মাটির ওপরে পদাতিক বাহিনীর সবচেয়ে সাধারণ কাজগুলোও এখন করে দিচ্ছে রোবট। ছদ্মবেশী জালের নিচে বসে ‘সাইবার’ নামের এক যোদ্ধা ও তার দল একটি ট্যাংকের ট্র্যাকে ব্রাউনিং হেভি মেশিনগান মাউন্ট করার কাজ করছিলেন। এই রোবট যানটিতে একগুচ্ছ ক্যামেরা বসানো আছে, যা লক্ষ্যবস্তুর চারপাশের চওড়া ভিউ দিতে পারে। ট্র্যাক থেকে শুকনো কাদা পরিষ্কার করতে করতে সাইবার বলেন, এই মেশিনটি কোনো পানি, খাবার বা বিশ্রাম ছাড়াই দিনের পর দিন ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে শিকারের জন্য অপেক্ষা করতে পারে। এর একমাত্র সীমাবদ্ধতা হলো গুলি। ৪০০ রাউন্ড গুলি শেষ হলে এটিকে আবার ঘাঁটিতে ফিরে আসতে হয়। সাইবার বলেন, আমরা যখন শত্রুর বিরুদ্ধে এই রোবটটি নামিয়েছিলাম, তারা স্রেফ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। তারা মাটিতে শুয়ে হামাগুড়ি দিচ্ছিল,কী করবে কিছুই বুঝতে পারছিল না।
সাইবারের ইউনিটে এমন পাঁচটি রোবট রয়েছে। তারা এখন ঘণ্টায় ১০ মাইল বেগে চলতে সক্ষম আরও একটি দ্রুতগতির রোবট তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন, যা কালাশনিকভ রাইফেল নিয়ে যুদ্ধ করতে পারবে। ইউক্রেনের এই অটোমেশনের গতি স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে এই মানবহীন যানগুলো ফ্রন্টলাইনের বিরল কৌতূহল থেকে নিয়মিত সামরিক সরঞ্জামে পরিণত হয়েছে। এগুলো এখন আহতদের উদ্ধার করা বা ফ্রন্টলাইনে রসদ সরবরাহের কাজও করছে।
তবে রুশ ড্রোনের সার্বক্ষণিক নজরদারির কারণে এই রসদ সরবরাহকারী রোবটগুলোতে মালামাল লোড করাও চরম ঝুঁকিপূর্ণ। ৯৩তম ব্রিগেডের সদস্যরা দ্রুঝকিভকা শহরের চারপাশে ছুটে বেড়ান গাছের নিচে লুকিয়ে থাকা রোবট ইউনিটের কাছে গোলাবারুদ, খাবার ও পানি পৌঁছে দিতে। শহরটিতে এখনো সাধারণ মানুষ বসবাস করেন, কিন্তু রুশ ড্রোনের নিখুঁত হামলার কারণে ইউক্রেনীয় সেনারা বেসামরিক নাগরিকদের সঙ্গে মিশে থাকতে পারেন না।
সম্মুখ সমরে এক বছর
ফ্রন্টলাইনের ইউক্রেনীয় সেনাদের জন্য এই রসদ এখন ভীষণ জরুরি, কারণ তারা প্রায় শেষ সীমায় পৌঁছে গেছেন। এর কিছু সময় পর এমন দুই যোদ্ধার সঙ্গে দেখা হলো, যাদের অবস্থা দেখে স্পষ্ট বোঝা যায় কিয়েভ সামরিক বয়সি পুরুষদের খুঁজে পেতে কতটা হিমশিম খাচ্ছে।
২৪তম মেকানাইজড ব্রিগেডের দুই সেনা ‘ক্রো’ এবং ‘ক্রিপি’ (ছদ্মনাম)। তারা যথাক্রমে ৩৪৪ দিন এবং ৩৩৪ দিন ধরে বিরতিহীনভাবে ফ্রন্টলাইনের বাঙ্কারে কাটিয়েছেন। ক্রোর ক্লান্ত চাউনি আর অবশ হেঁটে আসা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল তার ওপর দিয়ে কী ধকল গেছে। আজ ভোরে তার সেই অগ্নিপরীক্ষার অবসান ঘটেছে, যখন তিনি নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে ১২ ঘণ্টায় ২০ মাইল হাঁটা শুরু করেছিলেন। তিনি বলেন, একমাত্র আমার সন্তান আর স্ত্রীর কথা ভেবেই আমি টিকে ছিলাম, নয়তো অনেক আগেই পাগল হয়ে যেতাম।
ক্রো শিগগিরই বাড়ি ফিরবেন, তবে এক দিনের জন্য তার ৯ বছর বয়সি ছেলের জন্মদিন মিস হয়ে গেছে। বাঙ্কারে যাওয়ার পর থেকে স্ত্রীর সঙ্গে তার সরাসরি কোনো কথা হয়নি। তিনি বলেন, আমি ওয়াকিটকিতে তার জন্য মেসেজ রেকর্ড করে পাঠিয়ে দিতাম।
অন্যদিকে ‘ক্রিপি’র শরীর থেকে তীব্র গন্ধ বের হচ্ছিল, তবে তার চোখে-মুখে ছিল এক অপরাজেয় মনোভাব। ড্রোন হামলা এতটাই অবিরাম ছিল যে, বাঙ্কার তৈরি করার সময়টুকুও তারা পাচ্ছিলেন না। সবচেয়ে ভয়াবহ দিনের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, আমরা বস্তায় মাটি ভরে তা সাজিয়ে নেওয়ার সময়টুকু পাচ্ছিলাম না। বস্তা শেষ হয়ে গিয়েছিল। আমরা নিজেদের বাঁচাতে যা হাতের কাছে পেয়েছি, তা দিয়েই মাথা ঢেকেছি, যাতে মরে না যাই।
প্রায় এক বছর পর এই দুই যোদ্ধা যখন তাদের প্রথম কোমল পানীয়ের চুমুক দিচ্ছিলেন আর পরিষ্কার কাপড়ের কথা ভাবছিলেন, ঠিক তখনই ক্রামাতোরস্ক শহরের আকাশে আরও একটি এফপিভি (ফার্স্ট-পারসন ভিউ) ড্রোনের শব্দ শোনা গেল। মুহূর্তে স্থানীয় মানুষজন দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটতে শুরু করলেন। এই যুদ্ধক্ষেত্রে যন্ত্র এখন সর্বত্র বিদ্যমান, আর এই যন্ত্রই এখন বদলে দিচ্ছে যুদ্ধের পুরো সংজ্ঞা।