বারনই এখন ‘বিষাক্ত’ মরা খাল!
রাজশাহীতে আলোচনা সভায় অভিমত ‘বারনই রক্ষায় প্রয়োজন সকলের সমন্বিত উদ্যোগ’

নিজস্ব প্রতিবেদক :
একদা প্রমত্তা বারনই এখন এক ‘বিষাক্ত’ মরা খাল। দুর্গন্ধে নদীর কাছেই যেতে পারে না মানুষ। রাজশাহীর পবা উপজেলার নওহাটায় ‘জীবন-জীবিকা, সংস্কৃতি, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বারনই নদী রক্ষায় করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় নদীপাড়ের বাসিন্দাদের মুখে এই আর্তনাদ ফুটে উঠেছে। আজ সোমবার (১৩ অক্টোবর) বিকালে পবা উপজেলার নওহাটা মহিলা ডিগ্রী কলেজে এই সভার আয়োজন করে রুলফাও, এএলআরডি, বেলা। এতে সহযোগিতা করে মাসাউস, পরিবর্তন, দিনের আলো হিজড়া সংঘসহ কয়েকটি বেসরকারী সংস্থা।
‘নদীর জন্য একসাথে-নদী রক্ষায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ’ স্লোগানে সমন্বিত দিনব্যাপী কর্মসূচিতে নদীপাড়ের বাসিন্দারা অংশ নেন। সভায় অংশ গ্রহণকারীরা নিজ অবস্থান থেকে বারনই রক্ষায় ভূমিকা রাখার অঙ্গীকার করেন।
বক্তারা বলেন, রাজশাহীর তানোরের শিব নদী থেকে নওহাটা পৌরসভার বাগধানী এলাকায় বারনই এর উৎপত্তি। এরপর বারনই নাটোরের সিংড়া উপজেলার শেরকোল হয়ে আত্রাই নদী সাথে মিলিত হয়ে সিরাজগঞ্জে যমুনা নদীতে মিলিত হয়েছে। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৯৩ কিলোমিটার। গড় প্রস্থ ৫১ মিটার। একসময় এই নদীতে লঞ্চ ও বড় বড় নৌকা চলত। দুই পারের কৃষকেরা বারনই নদীর পানি কৃষি কাজে ব্যবহার করতো। এখন উজানের পানির অভাব, ড্রেজিং না করা ও পৌরবর্জ্য নদীর নাব্যতা হারিয়েছে। নর্দমার খাল হয়ে বারনই নদীতে পড়ছে রাজশাহী সিটি করপোরেশন, নওহাটা পৌরসভা, ভবানীগঞ্জ পৌরসভা, তাহেরপুর পৌরসভা, সিংড়া পৌরসভা এলাকার দূষিত বর্জ্যপানি। এছাড়া নদীর দুপাশের বিভিন্ন হাট-বাজারের ময়লা-আবর্জনাও নদীতে ফেলা হয়। ফলে নদীটি এখন এতই দূষিত যে মাছও বাঁচতে পারে না। পানি ব্যবহারে মানুষের চর্মরোগ হয়।
আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন রুলফাও নির্বাহী পরিচালক আফজাল হোসেন। সঞ্চালক ছিলেন সামাজিক কল্যাণ পরিষদের নির্বাহী পরিচালক সম্রাট রায়হান। প্রধান অতিথি ছিলেন অতিথি ছিলেন নওহাটা পৌরসভার সাবেক মেয়র মকবুল হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের রাজশাহীর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী পার্থ সরকার, পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহীর সহকারী পরিচালক কবির হোসেন, রাজশাহী সিটি করপোরেশনের উপ-প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা সেলিম রেজা রঞ্জু। এছাড়া প্রথম আলোর নিজস্ব প্রতিবেদক আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ, রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদ মোঃ জামাত খান, বেলা রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের সমন্বয়ক তন্ময় স্যানাল, এএলআরডির প্রতিনিধি সানজিদা খান রিপা, সাংস্কৃতিক কর্মী ওয়ালিউর রহমান বাবু, কলেজ শিক্ষক মাসুদুর রহমান মাসুদ, দিনের আলো হিজড়া সংঘের সভাপতি মোহনা ও বাঁচার আশা সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি মোস্তফা সরকার বিজলী প্রমুখ বক্তব্য দেন।
সভায় নওহাটারবাঁচারআশা সাংস্কৃতিক সংঘের সভাপতি মোস্তফা সরকার বিজলী বলেন, ‘রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকার বসতবাড়ির শৌচাগারের মল চলে আসে ড্রেনে। সেই ড্রেনের পানি খাল দিয়ে আসে বারনই নদীতে। এ পানি আর ব্যবহার করা যায় না। নদীপাড়ের প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ চর্মরোগে ভুগছেন নদীর পানি ব্যবহার করে। পানি এতই দূষিত যে মাছ বাঁচে না। পবার দুয়ারি থেকে নওহাটা পর্যন্ত এলাকায় দুর্গন্ধে ঘরবাড়ির জানালা বন্ধ রাখতে হয়।’
বারনইয়ের দূষিত পানি শিব নদী হয়ে তানোরেও যাচ্ছে বলে সভায় জানান পৌরসভার সাবেক নারী কাউন্সিলর মোমেনা আহমেদ। তিনি বলেন, ‘এই নদীটা দখলের কারণে মৃতপ্রায়। দ্রুত নদীর সীমানা নির্ধারণ করে পিলার স্থাপন করতে হবে। নদীকে বাঁচাতে হবে।’
নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি রিপন আলী বলেন, ‘এই নদী দিয়ে আমাদের বাপ-দাদারা নৌকায় করে বাগমারার তাহেরপুরে কৃষিপণ্য নিয়ে আসতেন। এখন বছরের বেশিরভাগ সময় পানি থাকে না। পুঠিয়ায় অপরিকল্পিতভাবে রাবার ড্যাম নির্মাণের কারণে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে প্রচুর কচুরিপানা থাকে। এখন নৌপথও বন্ধ হয়ে গেছে।’
রাজশাহীর বাগমারা প্রেসক্লাবের সভাপতি রাশেদুল হক ফিরোজ বলেন, নদীর দুপাড়ের হাট-বাজার থেকে প্রচুর ময়লা-আবর্জনা নদীতে ফেলার কারণে নদীটি নাব্যতা হারিয়ে ফেলেছে। এটি ড্রেজিং করতে হবে। রাজশাহী রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সাধারণ সম্পাদক জামাত খান বলেন, পৌরসভার মেয়ররা নদীতে ময়লা-আবর্জনা ফেলা বন্ধ করেন না। কারণ, নদী যতই ভরাট হবে, ততই দখল সহজ হবে। এভাবে নদীর দুইপাশে বহু অবৈধ স্থাপনা গড়ে উঠেছে।





