কৃষিতে বিষের ছড়াছড়ি: বাজার নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্র কোথায়?

দৈনিক রাজশাহী প্রকাশ : ২১ মে ২০২৬, ০৫:৫৯ পিএম আপডেট : ২১ মে ২০২৬, ০৭:০৮ পিএম ২২ বার পঠিত
কৃষিতে বিষের ছড়াছড়ি: বাজার নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্র কোথায়?
মোঃ শহিদুল ইসলাম

কৃষিতে বিষের ছড়াছড়ি: বাজার নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্র কোথায়?

দৈনিক রাজশাহী
২১ মে ২০২৬

মোঃ শহিদুল ইসলাম

বাংলাদেশের কৃষি ঠিক এই মুহূর্তে এমন এক সংকটের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে, যার শিকড় কৃষি উৎপাদনের মূল দর্শনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর প্রতিযোগিতা যত জোরালো হয়েছে, ততই মাঠে কীটনাশক নির্ভরতা বেড়েছে। অথচ কৃষি ও পরিবেশের স্বার্থরক্ষায় দেশের আইন-কানুনের ইতিহাস দীর্ঘ ও জটিল। ব্রিটিশ আমলের ১৮৭৭ এবং ১৯১৪ সালের ডেসট্রাকটিভ ইনসেক্টস অ্যান্ড পেস্টস অ্যাক্ট দিয়ে যে নিয়ন্ত্রণ কাঠামো শুরু হয়েছিল, তা স্বাধীনতার পর পেস্টিসাইডস অর্ডিন্যান্স ১৯৭১, পেস্টিসাইডস রুলস ১৯৮৫, সংশোধিত বিধিমালা এবং সবচেয়ে আধুনিক পেস্টিসাইডস অ্যাক্ট ২০১৮-তে এসে পূর্ণতা পেয়েছে। কাগজে দেখলে এটি নিখুঁত, সময়োপযোগী ও বৈজ্ঞানিক মনে হয়। কিন্তু মাঠে এর উল্টো দৃশ্য, কৃষকের হাতে এমন সব রাসায়নিক তুলে দেওয়া হয়, যা ফসলের চেয়ে মানুষ, প্রাণবৈচিত্র্য, নদী-নালা ও ভবিষ্যৎকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে বড় প্রশ্ন দাঁড়ায় এই বিষের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে রাষ্ট্র কোথায়?

২০১৮ সালের আইনটি অত্যন্ত শক্তিশালী। কীটনাশকের সংজ্ঞা, উৎপাদনকারী সংস্থা, রেজিস্ট্রেশন, আমদানি-রপ্তানি, পরিবহন, বিক্রি, ব্যবহারের মাত্রা, ভেজাল, অবৈধ বিপণনসহ সবকিছু বিস্তারিতভাবে বলা আছে। এতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার টক্সিসিটি মানদণ্ড অনুযায়ী কীটনাশক শ্রেণিবিন্যাস এলডি৫০ মান পর্যন্ত নির্ধারিত, যা আন্তর্জাতিক মানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে এর ধারাগুলোতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে, যেকোনো অবৈধ ভেজাল বা নিষিদ্ধ কীটনাশক বাজারজাত করলে জরিমানা, লাইসেন্স বাতিল ও কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। এমনকি ৩১ ও ৩২ সেকশনে স্বাস্থ্য ও পরিবেশের ক্ষতির দায়ে প্রতিষ্ঠানকে ফৌজদারি জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব। অর্থাৎ আইনটি সুস্পষ্টভাবে মানবস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও কৃষি তিনটির সমন্বিত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সক্ষম।

সমস্যা হলো এই আইন কাগজে আছে, কিন্তু মাঠে নেই। বাংলাদেশ রিসোর্স সেন্টার ফর ইন্ডিজিনাস নলেজ (বারসিক)-এর গবেষণায় দেখা যায়, বাজারে এখনো নিষিদ্ধ কীটনাশক ব্যবহার হচ্ছে। বাংলাদেশের কীটনাশক দোকানগুলোর বড় অংশই প্রশিক্ষণহীন ও লাইসেন্সহীন। অনেক দোকানদার নিজেরাই জানেন না কোন পণ্য নিষিদ্ধ, কোনটি উচ্চ ঝুঁকির, কোনটির মাত্রা কী, কীভাবে ব্যবহার করতে হয়। লাইসেন্স আছে কী নেই তা নিয়ে তদারকির অভাব আছে। রেজিস্ট্রেশন বাতিল হওয়া রাসায়নিকও কিছু এলাকায় সহজেই পাওয়া যায়। বাজারে মারাত্মক ক্ষতিকর ক্লাস ১এ এবং ক্লাস ১বি কীটনাশক খুব সহজে মিলছে, যেগুলো কৃষকের শরীর, বাচ্চাদের শ্বাসতন্ত্র, নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য এবং গবাদিপশুর ওপর মারাত্মক ক্ষতিকর। এর অর্থ হলো আইন যতই কঠোর হোক, বাজারে রাষ্ট্রের উপস্থিতি খুবই দুর্বল।

এদিকে পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের কাছে আরও অনেক আইন আছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫, জীববৈচিত্র্য আইন ২০১৭, পানি আইন, বন আইন, পরিবেশ আদালত আইন- এগুলোর প্রতিটিই মাটি, পানি, বায়ু, বন্য প্রাণী, পাখি, মাছ, পরাগায়নকারী (মৌপতঙ্গ) অণুজীবসহ বাস্তুতন্ত্রের সুরক্ষার কথা বলে। কিন্তু কৃষিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক কীভাবে নদীতে গিয়ে মাছ মারে, পুকুরে গিয়ে ডিম ধ্বংস করে, পরাগায়নকারী মৌপতঙ্গের সংখ্যা কমায়, ব্যাঙ ও পাখি বিলুপ্ত করে- এসব নিয়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কোনো কার্যকর সমন্বয় নেই। ফলে কীটনাশক আইনে যা বলা আছে, তা পরিবেশ আইনে প্রতিফলিত হয় না। পরিবেশ আদালতে কৃষির বিষ ব্যবহারের কারণে জীববৈচিত্র্য ক্ষতির মামলা প্রায় হয়ই না, কারণ পর্যাপ্ত ল্যাবরেটরি, মনিটরিং, প্রমাণ সংগ্রহ এসব নেই। এই সমন্বয়হীনতাই বাস্তবে আইনকে দুর্বল করে।

একদিকে কৃষি মন্ত্রণালয় কীটনাশক অনুমোদন দেয়, অন্যদিকে পরিবেশ মন্ত্রণালয় দূষণ কমানোর চেষ্টা করে, কিন্তু বাস্তবে দু’পক্ষই আলাদা ট্র্যাকে চলে। ফলে বিষ ব্যবহারের কারণে যদি একটি নদীতে মাছ মারা যায় বা একটি এলাকার মৌমাছি কমে যায় কিংবা পাখির মৃত্যু বাড়ে, কেউই নিশ্চিতভাবে দায়ীকে চিহ্নিত করতে পারে না। আইনের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সরকারি বিভিন্ন সংস্থার আলাদা কাজ এবং সমন্বয়ের অভাব বিষের বাজারকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে।

কৃষকের দিকটি আরও করুণ। বারসিকের গবেষণায় দেখা গেছে, বরেন্দ্র অঞ্চলসহ দেশের বহু স্থানে কৃষকরা সুরক্ষা সরঞ্জাম ছাড়া কীটনাশক স্প্রে করেন জমিতে। কেমিক্যাল মিশিয়ে একই দিনে ক্ষেতে কাজ করেন, গবাদিপশু চরান, বাড়িতে সবজি নিয়ে আসেন। শিশু-কিশোররা স্প্রে করা জমিতে খেলতে যায়। কৃষকের মাথা ঘোরা, বমি, শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালা, ত্বক পোড়া- এই লক্ষণগুলো প্রায়ই দেখা যায়। দীর্ঘমেয়াদে স্নায়ুতন্ত্র নষ্ট হওয়া, ক্যানসারের ঝুঁকি, হরমোন ব্যাঘাত, পুরুষদের প্রজনন সমস্যা, নারীর প্রজনন স্বাস্থ্য ক্ষতি- এসব এখন অহরহ দেখা যায়, কিন্তু কৃষক জানেন না এটি কীটনাশকের প্রভাব। স্বাস্থ্য খাতে কৃষকদের বিষাক্ত রাসায়নিকজনিত সমস্যার কোনো আলাদা নথি নেই। রাষ্ট্র এই মানবিক বিপর্যয়কে কখনো গুরুত্ব দিয়ে নথিভুক্ত পর্যন্ত করেনি। শুধু কৃষকই নয়, শহরের ভোক্তা শ্রেণিও এই বিষমাখা খাদ্য খেয়ে দিনে দিনে বড় বড় রোগের শিকার হচ্ছেন।

বিষের প্রভাবে প্রাণবৈচিত্র্য ধ্বংস হওয়াটা আরেকটি বড় সংকট। পরাগায়নকারী মৌমাছির সংখ্যা কমে গেলে কৃষিই ব্যাহত হয়; ব্যাঙ ও কীটভুক পাখি কমে গেলে প্রাকৃতিকভাবে পোকা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা কমে যায়; জলাশয়ে মাছের ডিম ধ্বংস হয়; মাটির অণুজীব মারা যায়; জমির উর্বরতা কমে যায়; ফলে আরও বেশি রাসায়নিক ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। এভাবে কৃষি এক ভয়াবহ দুষ্টচক্রে পড়ে যায়। জীববৈচিত্র্য আইন ২০১৭ এই ক্ষতির বিরুদ্ধে শক্তিশালী; কিন্তু কৃষিক্ষেত্রে বিষের ব্যবহারকে জীববৈচিত্র্য ক্ষতির অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে কার্যকরভাবে চিহ্নিত করতে রাষ্ট্র এখনো ব্যর্থ। ফলে আইন বাস্তবে গিয়ে অকার্যকর হয়ে পড়ে।

২০২৩ সালে সরকার কার্বোফিউরানসহ কিছু ক্ষতিকর কীটনাশক নিষিদ্ধ করেছে, এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু কোনো নিষিদ্ধ রাসায়নিক যদি দোকানে পাওয়া যায়, তা প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত মাঠ পর্যায়ে প্রয়োগ করা হয়নি। নিষিদ্ধ ঘোষণার পরও বাজারে পাওয়া মানে আইনকে অকার্যকর রাখা হয়েছে। এই পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে হলে নীতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে যে গভীর ফাঁকফোকর আছে, তা পূরণ করতে হবে। প্রথমত, কৃষি, পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও শিল্প- এই চার মন্ত্রণালয়কে একীভূত করে একটি সমন্বিত ‘পেস্টিসাইড গভর্ন্যান্স কাউন্সিল’ গঠন করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, কীটনাশক দোকানের লাইসেন্সিং ব্যবস্থা ডিজিটাল করতে হবে এবং দোকানদারকে প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। তৃতীয়ত, ভেজাল ও নিষিদ্ধ কীটনাশকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ অভিযান চালাতে হবে। চতুর্থত, কৃষকের জন্য মৌসুমভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং পিপিই নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, পরিবেশ আদালতকে কৃষিক্ষেত্রে বিষ ব্যবহারের কারণে জীববৈচিত্র্য ক্ষতির বিচার করার ক্ষমতা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে। শেষত, রাসায়নিক কীটনাশক কমিয়ে ধীরে ধীরে বিকল্প কৃষি ব্যবস্থা অ্যাগ্রোইকোলজি গুরুত্ব পলিসিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং জৈব পদ্ধতি, লোকায়ত স্থানীয় জ্ঞান- এসবকেও জাতীয় কৃষি নীতির কেন্দ্রে আনতে হবে।

রাষ্ট্রকে বুঝতে হবে, ফসল বাঁচাতে গিয়ে আমরা মানুষকে হারাচ্ছি। যে কৃষকের ঘাম মাটির গন্ধকে জীবন্ত রাখে, সেই কৃষকই যদি বিষের প্রভাবে ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়ে, তাহলে কৃষির উন্নয়ন কীসের জন্য? খাদ্যনিরাপত্তা কি শুধু উৎপাদনের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায়, নাকি মানুষের জীবন, পরিবেশ, মাটি আর নদীর স্বাস্থ্য দিয়েও মাপা উচিত? বিষের বাজারে রাষ্ট্রের অনুপস্থিতি একদিন আমাদের কৃষি, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ডেকে আনবে। সময় হয়েছে, এখনই রাষ্ট্রকে মাঠে নামতে হবে, নইলে এই বিষধারার কৃষিই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে এক অদৃশ্য দুর্যোগের দিকে ঠেলে দেবে।

লেখক : নৃবিজ্ঞানী এবং পরিবেশ আইন গবেষক
মেইল: shahidul546mh@gmail.com

 

সম্পর্কিত নিউজ

অ্যাপ ইনস্টল করুন

এই নিউজ পোর্টালটি মোবাইল অ্যাপের মতো ব্যবহার করুন।