লালপুরে বিদেশী নাগরিক হেনস্তার আসামি বস্তির ছেলে আকাশের বিলাসী জীবন!

দৈনিক রাজশাহী প্রকাশ : ১৪ মে ২০২৬, ০২:০৫ পিএম আপডেট : ১৫ মে ২০২৬, ১১:২৭ এএম ২৬ বার পঠিত
লালপুরে বিদেশী নাগরিক হেনস্তার আসামি বস্তির ছেলে আকাশের বিলাসী জীবন!
টিকটকার আকাশ ও তার বাবা

লালপুরে বিদেশী নাগরিক হেনস্তার আসামি বস্তির ছেলে আকাশের বিলাসী জীবন!

দৈনিক রাজশাহী
১৪ মে ২০২৬

নিজস্ব প্রতিবেদক : শরীরে ট্যাটু দেখাতে অর্ধনগ্ন হয়ে বিছানায় মো. আকাশ (২৫)। পাশে দামি ম্যাকবুক, একাধিক ব্র্যান্ডের হাতঘড়ি, ভিসা কার্ড, ব্রেসলেট ও ১০টি মোবাইল। এর মধ্যে কয়েকটি আইফোন। কখনো সোয়া ৬ লাখ টাকার ইয়ামাহা আর-ওয়ান-ফাইভ মোটরসাইকেলে ঘোরাঘুরি, আবার কখনো কোটি টাকার ক্রাউন ক্রসওভার গাড়ি চালানোর নানা ছবি ও ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে আপলোড করেন তিনি। 

তার এহেন ‘রাজকীয়’ জীবনের আড়ালে আছে এক ভিন্ন বাস্তবতা। রাজশাহীর ভদ্রা লেকপাড়ের বস্তিতে জন্মগ্রহণকারী আকাশের বাবা মো. সেলিম এখনও ময়লার স্তুপ থেকে ভাঙারি কুড়িয়ে এবং মা শরিফা বেগম মাসিক তিন হাজার টাকায় গৃহকর্মীর কাজ করে সংসার চালান। স্থানীয়দের অভিমত, জুয়ার বোর্ড এবং নানা অবৈধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে অল্প বয়সে বিপুল অর্থের মালিক আকাশ।

সম্প্রতি নাটোরের লালপুরে গ্রিন ভ্যালি পার্কে বিদেশী নাগরিক হেনস্তায় জড়িয়ে আলোচনায় আসে আকাশ। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কয়েকজন রুশ নাগরিক নিয়ে অশ্লীল ও আপত্তিকর মন্তব্যের ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়ালে দেশজুড়ে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। এ ঘটনায় মামলার পর আত্মগোপনে চলে যান আকাশ।

জানা গেছে, জাতীয় পরিচয়পত্রের মো. আকাশ, সামাজিক মাধ্যমে ‘আরিয়ান মাহমুদ আকাশ’ নামে পরিচিত। তার ফেসবুকের ফলোয়াড় ১৮ লাখের বেশি। এইচএসসি পর্যন্ত পড়া আকাশ ফেসবুক প্রোফাইলে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত উল্লেখ করেছেন। ফেসবুক/টিকটকে অশ্লীল/আপত্তিকর কনটেন্ট প্রকাশ করেন তিনি। তাকে প্রায়ই যুবদল নেতাদের সঙ্গে ঘুরতে ও বিএনপির নেতাদের সঙ্গে ছবি তুলতে দেখা যায়। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ৮ মে ‘টিকটক বন্ধু মিলনমেলা-২০২৬’ উপলক্ষ্যে শতাধিক তরুণ-তরুণী গ্রিন ভ্যালি পার্কে জড়ো হন। পরদিন সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো এক ভিডিওতে, আকাশসহ কয়েক তরুণকে পার্কে ঘুরতে যাওয়া বিদেশী নাগরিককে অশ্লীল মন্তব্য করতে দেখা যায়। ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ায় সমালোচনার মুখে পার্ক কর্তৃপক্ষ লালপুর থানায় মামলা করেন। পুলিশ রাজশাহীর মোহনপুরের হরিদাগাছির কনটেন্ট ক্রিয়েটর আমিনুলকে গ্রেপ্তার করে। মূল অভিযুক্ত আকাশ এখনো ধরাছোয়ার বাইরে।

নগরীর ভদ্রা লেকপাড় বস্তিতে গিয়ে জানা যায়, টিনশেড ছোট্ট ঘরে বাস করেন আকাশের বাবা-মা ও বোন। পরিবারের সদস্যরা জানান, আকাশ এখানেই থাকতো। দুই বছর আগে বিয়ে করে স্ত্রীকে নিয়ে ভাড়া বাসায় ওঠেছে। এরপর বস্তিতে খুব কমই আসে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, টিকটকে জনপ্রিয়তার আগে আকাশ বখাটেদের নিয়ে চুরি-ছিনতাই করতেন। এক আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে জুয়ার বোর্ড চালাতেন। সরকার পরিবর্তনে সেই নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ তার হয়। এছাড়া বস্তির মাদক সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণও তার হাতে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, দলবল নিয়ে টিকটক ভিডিও তৈরির নামে রাস্তায় মেয়েদের উত্ত্যক্ত করত আকাশ ও সহযোগীরা। কয়েক মাস আগে ভদ্রা আরডিএ পার্কে বিনা টিকিটে প্রবেশে বাধা দেওয়ায় আনসার সদস্যকে পিটিয়ে গ্রেপ্তার হন আকাশ। ওই মামলায় ২৫ দিন পর জামিনে মুক্ত হন। তবে রাজশাহীর মেট্টোপলিটন  ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১, এ মামলাটি বিচারাধীন।

আদালত সূত্র জানায়, ১৩ মে ধার্য তারিখে আকাশ আদালতে হাজির হননি। তিনি অসুস্থ বলে আইনজীবী সময়ের আবেদন করলে আদালত মঞ্জুর করেন। পরবর্তী ধার্য্য তারিখ আগামী ১২ আগস্ট। আকাশের বাবা মো. সেলিম বলেন, ‘লালপুরের ঘটনার পর পুলিশ কয়েক দফা বাসায় এসেছে। কিন্তু ছেলে কোথায় আছে, তা আমরা জানিও না।’

নগরীর ২৬ নং ওয়ার্ড যুবদলের কয়েক নেতাকর্মী জানান, আকাশ যুবদলের কর্মী হিসেবে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিতো। তবে তার সাংগঠনিক পদ নেই। তবে মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক শরিফুল ইসলাম জনি দাবি করেন, তিনি আকাশকে চেনেন না।

এদিকে বিদেশী নাগরিক হেনস্তার এক সপ্তাহেও আকাশ গ্রেপ্তার না হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ বাড়ছে। এ বিষয়ে লালপুর থানার ওসি শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনার পর একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রকৃত অভিযুক্ত আকাশকে ধরতে অভিযান চলছে। আকাশের মোবাইল ফোন বন্ধ। তবে ফেসবুকে এক ভিডিও বার্তায় আকাশ বলেছেন, ‘বিদেশীর সঙ্গে একটু মজা করতে গিয়ে ঘটনাটি ঘটেছে। আমি এ ধরনের ভিডিওই বানাই। তাদের হেনস্তার উদ্দেশ্য ছিল না। হয়তো কথাগুলো বলা ঠিক হয়নি। সবাই আমাকে ক্ষমা করবেন।’ 

 

সম্পর্কিত নিউজ

অ্যাপ ইনস্টল করুন

এই নিউজ পোর্টালটি মোবাইল অ্যাপের মতো ব্যবহার করুন।