হরমুজ প্রণালী:

ট্রাম্পের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ বনাম ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রাচীর

দৈনিক রাজশাহী প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৬, ০৩:২৫ পিএম আপডেট : ০৭ মে ২০২৬, ১১:২৩ এএম ৭ বার পঠিত
ট্রাম্পের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ বনাম ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রাচীর

ট্রাম্পের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ বনাম ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র প্রাচীর

দৈনিক রাজশাহী
০৪ মে ২০২৬
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথ ‘সচল’ করার দোহাই দিয়ে ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ অভিযান শুরু করলেও, হরমুজ প্রণালীর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ এখনও ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) হাতেই। ট্রাম্পের ঘোষণার পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরান জলপথে ‘স্মার্ট কন্ট্রোল’ ও ‘ক্ষেপণাস্ত্র প্রাচীর’ তৈরি করে মার্কিন সামরিক চ্যালেঞ্জের মুখে এক দুর্ভেদ্য প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। ফলে এই কৌশলগত জলপথ এখন আর কোনো সামাজিকযোগাযোগ মাধ্যমের পোস্ট নয়, বরং ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের কঠোর নজরদারিতে পরিচালিত হচ্ছে। আইআরজিসির নতুন সীমানা ও সামরিক কৌশল আইআরজিসি সম্প্রতি এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালীতে তাদের ‘স্মার্ট নিয়ন্ত্রণের’ সীমানা নির্ধারণ করে দিয়েছে। এতে হরমুজ প্রণালীর অবরোধ আরও বড় করে আরব আমিরাতের পূর্বাঞ্চলীয় বন্দর খোর ফাক্কান ও ফুজাইরাহকেও এর আওতায় এনেছে। এই বন্দরগুলো থেকে কোনো জাহাজ ইরানের অনুমতি ব্যতীত ওমান উপসাগরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করলে সেগুলোতে হামলা চালানো হবে। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর এই নতুন প্রতিরক্ষা বলয়টি দুটি অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট রেখা দ্বারা চিহ্নিত: ১. দক্ষিণ সীমানা: ইরানের কুহ-এ মোবারক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরার দক্ষিণ অংশের মধ্যবর্তী রেখা। ২. পশ্চিম সীমানা: ইরানের কেশম দ্বীপের শেষ প্রান্ত থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উম্মুল কাইওয়াইনের মধ্যবর্তী রেখা। আইআরজিসি মুখপাত্রের কড়া বার্তা: ‘নিরাপদ পারাপারের শর্ত’ হরমুজ প্রণালীর বর্তমান ব্যবস্থাপনা নিয়ে আইআরজিসি মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হোসেন মোহেবি এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, প্রণালীর ব্যবস্থাপনায় ইরান কোনো পরিবর্তন আনেনি, তবে এখানে চলাচল করতে হলে ইরানের নিয়ম মেনেই করতে হবে। জেনারেল মোহেবি জানিয়েছেন, যেকোনো বেসামরিক বা বাণিজ্যিক জাহাজ যদি আইআরজিসি নৌবাহিনীর ট্রানজিট প্রোটোকল অনুসরণ করে এবং নির্ধারিত রুট অনুযায়ী সমন্বয় করে চলাচল করে, তবেই তাদের নিরাপদ পারাপার নিশ্চিত করা হবে। অন্যথায় শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে জাহাজ থামিয়ে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। রণক্ষেত্রে উত্তেজনা: সতর্কতামূলক গুলি ও হামলা ইরানের সেনাবাহিনীর জনসংযোগ পরিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রণালীর পরিস্থিতির পারদ এখন তুঙ্গে। সম্প্রতি মার্কিন নৌবাহিনীর কিছু ডেস্ট্রয়ার রাডার বন্ধ রেখে গোপনে প্রণালীর কাছাকাছি আসার চেষ্টা করলে ইরানি নৌবাহিনী তাদের কঠোর সতর্কবার্তা দেয়। প্রাথমিক সতর্কতা উপেক্ষা করার পর ইরানি বাহিনী ক্রুজ মিসাইল ও ড্রোন থেকে সতর্কতামূলক গুলি চালিয়ে তাদের পথ রোধ করে। সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজ দাবি করেছে, জাস্ক দ্বীপের কাছে একটি মার্কিন জাহাজে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে, যদিও মার্কিন সেন্টকম তা অস্বীকার করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বাল্ক ক্যারিয়ারে হামলা প্রণালীর ভেতরে নোঙর করা অবস্থায় দক্ষিণ কোরিয়ার পতাকাবাহী ‘HMM Namu’ নামক একটি বাল্ক ক্যারিয়ারও হামলার শিকার হয়েছে। সোমবার রাত ৮:৪০ মিনিটে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উম্মুল কাইওয়াইন বন্দরের কাছে জাহাজটির ইঞ্জিন রুমে শক্তিশালী বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। জাহাজে থাকা ২৪ জন ক্রু (৬ জন দক্ষিণ কোরীয় ও ১৮ জন বিদেশি) নিরাপদ থাকলেও জাহাজের কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া সরকার এই ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে এবং এটি ইরানের ‘স্মার্ট কন্ট্রোল’ প্রোটোকল ভঙ্গের পরিণাম কি না, তা নিয়ে কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক গুঞ্জন চলছে। আমিরাতের তেলের ট্যাংকারে হামলা উত্তেজনার রেশ ছড়িয়ে পড়েছে আমিরাতের জলসীমাতেও। হরমুজ প্রণালীতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি তেলের ট্যাংকারে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের রেজুলেশন ২৮১৭-এর সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তারা ইরানকে এই ধরনের সংঘাত থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেছে। তবে ইরানের পাল্টা যুক্তি হলো, বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপই এই অঞ্চলে অস্থিরতার মূল কারণ। ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ বনাম জেফরি স্যাক্সের বিশ্লেষণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘প্রজেক্ট ফ্রিডম’ অভিযানে ১৫,০০০ সামরিক সদস্য ও বিশাল যুদ্ধজাহাজের বহর মোতায়েনের কথা বলা হয়েছে। বিশিষ্ট মার্কিন অর্থনীতিবিদ জেফরি স্যাক্স একে ‘জলদস্যুতা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। স্যাক্সের মতে, মার্কিন সামরিক আধিপত্যের দিন ফুরিয়ে আসছে এবং বর্তমান বিশ্বে ‘ইরান’ নামক এক নতুন সামরিক শক্তির উত্থান ঘটেছে, যাকে নৌ-অবরোধের মাধ্যমে দমানো অসম্ভব। এমনকি নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, ট্রাম্পের শুরু করা এই যুদ্ধ আমেরিকান জনগণের ওপর এক বিশাল আর্থিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি করছে। ‘ট্রাম্পের পোস্ট দিয়ে হরমুজ পরিচালিত হবে না’ ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির চেয়ারম্যান ইব্রাহিম আজিজি অত্যন্ত কড়া ভাষায় ওয়াশিংটনকে হুঁশিয়ার করেছেন। তার মতে, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা ব্যবস্থা কোনোভাবেই ট্রাম্পের কল্পনাপ্রসূত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট দিয়ে নিয়ন্ত্রিত হবে না। আজিজি স্পষ্ট করে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো হস্তক্ষেপকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য করা হবে এবং এর জবাব দেওয়া হবে অস্ত্রের ভাষায়।’ ‘৪০ দিনের যুদ্ধ’-এর স্মৃতি ও বর্তমান বাস্তবতা ইরানের সামরিক সূত্রগুলো সতর্ক করে দিয়েছে যে, পরিস্থিতি ‘৪০ দিনের যুদ্ধ’-এর মতো হতে পারে যেখানে আমেরিকান যুদ্ধজাহাজকে চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে না। ইরানের ‘খাতামুল আম্বিয়া (স.) কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর’-এর কমান্ডার মেজর জেনারেল আলি আবদুল্লাহি সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, কোনো বিদেশি আগ্রাসী বাহিনী প্রণালীর কাছে আসতে চাইলে তাদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হবে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের চোখে নতুন বাস্তবতা পরিশেষে বলা যায়, হরমুজ প্রণালীর নতুন সমীকরণ এখন আর কেবল ওয়াশিংটনের নীতিমালায় সীমাবদ্ধ নেই। ড্রোনের গুনগুন আর ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জনে লেখা হচ্ছে এই জলপথের নতুন ইতিহাস। ইব্রাহিম আজিজির ভাষায়, ‘দোষারোপের নাটক আর কেউ বিশ্বাস করে না’। বর্তমান বাস্তবতা হলো, হরমুজ প্রণালী এখন আর কেবল একটি উত্তরণের পথ নয়, এটি ইরানের জাতীয় নিরাপত্তার এক অজেয় দেয়াল। আর সেই দেয়াল টপকানোর চেষ্টা করলে ট্রাম্প প্রশাসনকে সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক ও রাজনৈতিক মূল্যের সম্মুখীন হতে হবে।

সম্পর্কিত নিউজ

অ্যাপ ইনস্টল করুন

এই নিউজ পোর্টালটি মোবাইল অ্যাপের মতো ব্যবহার করুন।