তদন্ত কমিটির বিরুদ্ধে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ : ‘কর্তৃত্ববিহীন’ তদন্ত বন্ধে ইউজিসি’র চেয়ারম্যানকে রাবি উপাচার্যের চিঠি

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় :
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) উপাচার্যের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল শিক্ষকদের একাংশের দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) গণশুনানির আয়োজন পক্ষপাতিত্বমূলক বলে অভিযোগ আনা হয়েছে। আজ বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ইউজিসির চেয়ারম্যান বরাবরে লেখা এক চিঠিতে রাবি উপাচার্য প্রফেসর এম আব্দুস সোবহান এই অভিযোগ তুলে কর্তৃত্ববিহীন তদন্ত কমিটির সকল কার্যক্রম বন্ধেরও অনুরোধ জানান। চিঠিতে রাবি উপাচার্য তাঁর বিরুদ্ধে আয়োজিত গণশুনানিকে ইউজিসির কর্তৃত্ব বহির্ভূত, আদালত অবমাননাকর এবং রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছেন।

চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘দি ইউনির্ভাসিটি গ্র্যান্ড কমিশন অব বাংলাদেশ অর্ডার ১৯৭৩ (দি ইউনির্ভাসিটি গ্র্যান্ড কমিশন অব বাংলাদেশ [এমিনডমেন্ট] অ্যাক্ট ১৯৯৮) এ উপাচার্যের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্তের জন্য তদন্ত কমিটি গঠনের কোন ক্ষমতা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে দেওয়া হয় নাই। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্যের বিরুদ্ধে নামে-বেনামে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্তে আপনার নির্দেশে তিন সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি গঠিত হয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (বিমক)-এর একজন সিনিয়র সহকারী পরিচালক এবং উপাচার্যের সমমর্যাদা সম্পন্ন বিমক-এর দুইজন সম্মানিত সদস্য সমন্বয়ে বর্ণিত তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে যা আইনসিদ্ধ নয়।’

চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘আইন অনুযায়ী তদন্ত কমিটির সদস্যবৃন্দের মর্যাদা উপাচার্যের মর্যাদার এক ধাপ উপরে হওয়া বাঞ্ছনীয়। রাজশাহী ইউনিভার্সিটি এ্যাক্ট ১৯৭৩ এর ১১ ধারা অনুযায়ী মহামান্য রাষ্ট্রপতি তথা আচার্য কর্তৃক উপাচার্য নিয়োগপ্রাপ্ত হন। উপাচার্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত তাই শুধুমাত্র নিয়োগকর্তা দ্বারা সম্পন্ন করা আইনসিদ্ধ। কিন্তু আইন বহির্ভূতভাবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন কর্তৃক একজন সিনিয়র সহকারী পরিচালক ও উপাচার্যের সমমর্যাদা সম্পন্ন দুইজন সদস্য সমন্বয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি কর্তৃক তদন্তকার্য পরিচালনা শুধু বেআইনিই নয় বরং এর মাধ্যমে মহামান্য রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাকেও খর্ব করা হয়েছে।’

রাবি উপাচার্য চিঠিতে বলেন, ‘রাজশাহী ইউনিভার্সিটি এ্যাক্ট ১৯৭৩ অনুযায়ী উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করেন। এই এ্যাক্টের ১২ ধারায় ১০টি অনুচ্ছেদ-এ (আরইউ ক্যালেন্ডার ভলিয়ম-১, পেজ-৭-৯) উপাচার্যের ক্ষমতা ও কর্তব্য বর্ণিত আছে। উপাচার্যের সিদ্ধান্তে কেউ সংক্ষুব্ধ হলে উক্ত এ্যাক্ট এর ৫১(১) ধারা (আরইউ ক্যালেন্ডার ভলিয়াম-১, পেজ-২৬) মোতাবেক সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি প্রতিকার চেয়ে আচার্য বরাবরে আবেদন করতে পারেন। অত্র এ্যাক্ট অনুযায়ী এই ক্ষমতা শুধুমাত্র মহামান্য রাষ্ট্রপতি তথা আচার্যকেই প্রদান করা হয়েছে।

চিঠিতে বলা আরও হয়েছে, উপাচার্যের বিরুদ্ধে যেসব মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ও আপীল বিভাগে পৃথক রিট পিটিশন বিচারাধীন রয়েছে। একই বিষয় নিয়ে তাই ইউজিসির তদন্ত বা প্রশ্ন উত্থাপন করা আদালত অবমাননার সামিলও বটে।’

উপাচার্য তার চিঠিতে তদন্ত কমিটির প্রধানের বিরুদ্ধেও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উত্থাপন করে চিঠিতে বলেন, ‘অতি সম্প্রতি পত্রপত্রিকায় তদন্ত কমিটির আহবায়কের তদন্তাধীন বিষয়ে বক্তব্য ও বিবৃতি প্রকাশিত হয়েছে। তদন্ত কাজ সম্পন্নের পূর্বেই গণমাধ্যমে এতদসংশ্লিষ্ট তাঁর বক্তব্য প্রদান কতটা সমীচিন বা আইনসিদ্ধ! তদন্তের পূর্বেই আমাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। অবশ্য অভিযোগকারীদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে স্থানীয়ভাবে প্রচার করছে যে, তদন্ত/শুনানী যাই হোক না কেন-রিপোর্ট আগেই লেখা হয়েছে। আহবায়ক মহোদয় পত্রিকায় সাক্ষাৎ দিয়ে বিষয়টি যেভাবে উপস্থাপন করেছেন, তা দেখে প্রতিয়মান হয় যে, তদন্তের আগেই মিডিয়া ট্রায়াল সম্পন্ন করা হয়েছে। যা দ্বারা একজন উপাচার্যকে নয় বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষককে অপদস্থ করা হয়েছে। আহবায়কের সাক্ষাৎকার থেকে প্রতিয়মান হয় যে, বিষয়টি উদ্দেশ্যমূলক। মাননীয় আহবায়কের বক্তব্য এবং ইতোপূর্বে তার সাথে বিমকে আমার যতবার দেখা ও কথা হয়েছে, তাতে তিনি অভিযোগকারীদের পক্ষ নিয়ে তর্ক করেছেন। সুতরাং এটি প্রতিয়মান হচ্ছে যে, আহবায়ক মহোদয় একটি পক্ষ অবলম্বন করেছেন- অর্থাৎ এই তদন্ত রিপোর্ট পক্ষপাতহীন না হওয়ার আশংকা রয়েছে।’

চিঠিতে রাবি উপাচার্য বলেন, ‘যে-কোনো অভিযোগ আমলযোগ্য হলে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণপূর্বক তার তদন্ত হওয়া বাঞ্ছনীয়। আমি তাই দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই যে, আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগসমূহের তদন্ত হোক-এ বিষয়ে আমি শতভাগ সম্মত। তবে সেই তদন্ত কমিটি অবশ্যই যথাযথ/আইনসিদ্ধভাবে গঠিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন উপাচার্যকে আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা খর্ব করে অপদস্থ করা সমীচিন নয়। এমতাবস্থায় উপরোল্লেখিত বিষয়টি সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত কর্তৃত্ববিহীন তদন্ত কমিটির সকল কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য অনুরোধ করছি।’

খবরটি শেয়ার করুন...
Share on Facebook0Share on Google+0Tweet about this on TwitterPin on Pinterest0Print this page

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি